বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের সাংবাদিকতার নানা বাস্তবতা, চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনা নিয়ে একটি ভার্চুয়াল ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস ২০২৬ উপলক্ষে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস ক্লাবের উদ্যোগে আয়োজিত এই ওয়েবিনারে ক্যাম্পাস সাংবাদিকতায় নিরপেক্ষতা বজায় রাখা, নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের নানা দিক উঠে আসে। পাশাপাশি সাংবাদিকতায় পেশাগত আচরণ, নৈতিকতা, সংবাদ উপস্থাপনার কৌশল, ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার গঠনে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি, গণমাধ্যমের সংকট ও সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়। অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন প্রশ্নের মাধ্যমে আলোচনায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে পরামর্শ গ্রহণ করেন।
রোববার (৩ মে) রাত ১০টার দিকে গুগল মিট প্ল্যাটফর্মে অনুষ্ঠিত এ ওয়েবিনারে প্রধান আলোচক হিসেবে যুক্ত ছিলেন আরটিভির অনলাইন বিভাগের ইনচার্জ আবু আজাদ।
ওয়েবিনারে বক্তব্য দিতে গিয়ে আবু আজাদ বলেন, ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা শুধু খবর সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একজন শিক্ষার্থীর পেশাগত ও নৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। তবে এই পথ সহজ নয়। নানা ধরনের চাপ, পক্ষপাত এবং সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সত্য ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা একজন ক্যাম্পাস সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাছাড়া একটি বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রের ভেতরে ঠিক যেন আরেকটি রাষ্ট্রের মতোই কাজ (ফাংশন) করে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের সাংবাদিকতাকে জাতীয় পর্যায়ের সাংবাদিকতার প্রথম পাঠ হিসেবে ধরে নেওয়া যায়।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ক্যাম্পাস সাংবাদিকতায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও এখনও অনেক ক্ষেত্রে তারা নানা সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন। একটি নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা গেলে এই খাতে নারীদের আরও সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এর জন্য গণতান্ত্রিক মনোভাবসম্পন্ন প্রশাসনিক পরিবেশও প্রয়োজন।
ওয়েবিনারে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে আবু আজাদ বলেন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। একটি সমাজে মানবাধিকার কতটা রক্ষিত হয় সেটিও বোঝা যায়— সেই সমাজে একজন সাংবাদিক কতটা নিরাপদে তথ্য সংগ্রহ এবং তা প্রকাশ করতে পারেন সেটি দেখে। এ কারণেই তথ্যের অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মৌলিক মানবাধিকারের অন্তর্ভুক্ত। তবে আমরা এমন এক সময়ে কাজ করছি, যখন তথ্যের প্রবাহ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্রুত। কিন্তু এর সঙ্গে বেড়েছে বিভ্রান্তি, অপতথ্য এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণার ঝুঁকি। এই বাস্তবতায় একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে। শুধু খবর প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; বরং সত্য যাচাই করে, প্রেক্ষাপট বুঝে এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে তথ্য উপস্থাপন করাই সাংবাদিকদের প্রধান কাজ। একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতা ছাড়া সাংবাদিকতা কার্যকর হয় না, আর দায়বদ্ধতা ছাড়া সেই স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে যায়। অতএব এই ভারসাম্য রক্ষা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
একটি বিকৃত ছবি অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ভুল বা বিকৃত তথ্য ও ঘৃণা ছড়ানো বক্তব্য সমাজে অনিরাপদ পরিস্থিতি তৈরি করে; কিন্তু তার মানে এই নয় যে, গণমাধ্যম বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এটি স্বল্পমেয়াদে যে নিরাপত্তা আনতে পারে, তা দীর্ঘমেয়াদে আরও অস্থিতিশীলতা ডেকে আনে। একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ— সাংবাদিক কখনও অ্যাক্টিভিস্ট নন, বরং তিনি দেশ ও মানুষের মানবাধিকারের আয়না এবং উন্নয়নের সহযোগী; সরকার ও ক্ষমতাশীলদের ‘অশুভ শক্তি’ নন, বরং ‘গঠনমূলক সমালোচক’। মাথায় রাখতে হবে উভয়ের কেন্দ্রেই জাতীয় স্বার্থ।
গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক সংকট নিয়ে আলাপকালে তিনি বলেন, প্রচলিত গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা ও নাগরিক সমাজের সমর্থন কমে যাওয়া, বিজ্ঞাপন বণ্টনে অস্বচ্ছতা, সাংবাদিকদের কম পারিশ্রমিক, হুমকি, মামলা ইত্যাদি গণমাধ্যমের বড় সংকট। যদিও বর্তমান সরকার নতুন করে সাংবাদিকদের পারিশ্রমিক নির্ধারণ, সরকারি প্রণোদনা এবং এই শিল্পকে রক্ষায় নতুন নীতিমালার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। গণমাধ্যমের সঙ্গে সংঘাতে না জড়ানোর পরিষ্কার বার্তাও দিয়েছে সরকার। এই প্রতিটি বিষয় আমাদের আশান্বিত করে।
তিনি আরও বলেন, তবে সরকারি-বেসরকারি অথবা যৌথভাবে কিছু উদ্যোগ জরুরি হয়ে পড়েছে। কার্যকর এমন প্রতিষ্ঠানের অভাব রয়েছে যারা ঝুঁকিতে থাকা গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের জরুরি তহবিল, নিরাপদ আশ্রয় বা পুনর্বাসন সহায়তা, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি সেবা দেবে। উন্নত দেশগুলোর মতো আমাদের দেশেও যদি এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে তবে গণমাধ্যম শক্তিশালী হওয়ার পথে আরও এক ধাপ অগ্রসর হবে।
ওয়েবিনারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি জিহাদুজ্জামান জিসান বলেন, তরুণ সাংবাদিকদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই এ ধরনের আয়োজন করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
প্রেস ক্লাবের দপ্তর, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক রোহান চিশতীর সঞ্চালনায় প্রাণবন্ত ওয়েবিনারে আরটিভি অনলাইনের নিউজরুম এডিটর ও সংগঠনটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সিফাত শাহরিয়ার প্রিয়ানসহ সংগঠনটির কার্যনির্বাহী সদস্য ও সহযোগী সদস্যরা যুক্ত ছিলেন।
আরটিভি/এমএইচজে




